ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (১০ জুলাই ১৮৮৫ - ১৩ জুলাই ১৯৬৯)ছিলেন বাংলা ভাষার একজন বিশিষ্ট ভাষাবিদ ও শিক্ষাবিদ । বাংলা ভাষার বিকাশ ও উন্নয়নে তার রয়েছে অমূল্য অবদান । তিনি ভাষাতত্ত্ব, ফোকলোর এবং ইতিহাসের ক্ষেত্রে গবেষণা করেন।বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রকে নতুন মাত্রা দিয়েছে তাঁর গবেষণা এবং সাহিত্যকর্ম । 

ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ।
 ভাষাবিদ ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ।

প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষাঃ

ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, পশ্চিমবঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) চব্বিশ পরগনার পেয়ারা গ্রামে ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মকবুল আহমদ পেশায় তিনি ছিলেন মসজিদের ইমাম এবং একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। ছোটবেলা থেকেই শহীদুল্লাহর মাঝে জ্ঞানের প্রতি গভীর আগ্রহ এবং প্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু গ্রামের স্কুলে। এরপর যান কলকাতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণের উদ্দেশ্যে এবং সেখানে সংস্কৃত, পালি, আরবি, ফারসি, ইংরেজি ও বাংলাসহ বিভিন্ন ভাষায় শিক্ষার সুযোগ পান। 


তিনি ১৯১০ইং সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংস্কৃতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ১৯১২ ইং সালে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ করেন। তিনি ভাষাতত্ত্ব এবং ফোকলোরের উপর গভীর গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯২৮ ইং সালে ফ্রান্সের সোরবন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এবং তাঁর গবেষণার বিষয় ছিল ‘পূর্ব ভারতে প্রচলিত প্রাচীন ভাষা’। 


কর্মজীবনঃ

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর কর্মজীবনের শুরু হয় কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। তিনি সেখানে অধ্যাপনা করার সময় শিক্ষার্থীদের মাঝে ভাষাতত্ত্ব ও সংস্কৃতি সম্পর্কে গভীর আগ্রহ সঞ্চার করেন। এরপরে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন এবং ভাষা গবেষণায় নতুন ধারা যুক্ত করেন। বাংলা ভাষার শুদ্ধরূপ ও বিশুদ্ধ ভাষা আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল অসামান্য।


তিনি বাংলা ভাষার সঠিক উচ্চারণ, বাক্যগঠন এবং ব্যাকরণ নিয়ে নানা গবেষণা পরিচালনা করেন তাছাড়াও বাংলা ভাষার মূল বিকাশ ও ইতিহাস চর্চায় নেতৃত্ব দেন।তাঁর গবেষণা বাংলা ভাষার শব্দভাণ্ডার এবং ভাষাগত পরিবর্তনের ওপর বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অনেক অবদান রেখেছে। 


ভাষা আন্দোলনে অবদানঃ

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করেন বাংলা ভাষার স্বাধীনতা এবং স্বীকৃতির পক্ষে । তিনি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের একজন সক্রিয় সমর্থক ছিলেন।তিনি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করতে ছাত্রসমাজ ও জনসাধারণকে অনুপ্রাণিত করেন এবং ভাষার সঠিক উচ্চারণ ও ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জোর দেন। 


ড.মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ‘বঙ্গভাষা ও সাহিত্য’ বইটি বাংলা ভাষার ইতিহাস সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ হিসেবে পরিগণিত হয়, যেখানে তিনি ভাষার উৎপত্তি, বিকাশ এবং পরিবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। ভাষা আন্দোলনের সময় তাঁর গবেষণা এবং দিকনির্দেশনা ভাষাপ্রেমিকদের অনুপ্রাণিত করেছিলো।


গবেষণা ও সাহিত্যকর্মঃ

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা, সংস্কৃত, পালি ও আরবি ভাষার পাশাপাশি বাংলা ফোকলোর, পুরাণ, ধর্মগ্রন্থ ও লোকসাহিত্য নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর রচিত গবেষণাগ্রন্থসমূহে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ‘বাংলা সাহিত্যের কথা’, ‘বাংলা ভাষার ইতিবৃত্ত’, এবং ‘রামায়ণের ঐতিহাসিকতা’।তিনি তাঁর গবেষণার মাধ্যমে বাংলা ভাষার আদি ইতিহাস তুলে ধরেন এবং ভাষার শুদ্ধরূপ এবং ঐতিহ্যের সংরক্ষণের জন্য সমাজকে অনুপ্রাণিত করেন।


ড. শহীদুল্লাহ’র আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ ছিল ফোকলোর সংগ্রহ এবং বিশ্লেষণ। তিনিই বাংলার লোকসাহিত্য, গান, প্রবাদ ও গল্পের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মূর্তি উন্মোচন করেন।তাকে তাঁর ফোকলোর বিষয়ক গবেষণা বাংলার আঞ্চলিক ভাষা ও উপভাষা সম্পর্কেও বিশদভাবে জ্ঞান লাভে সাহায্য করে। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস এবং বিভিন্ন অঞ্চলের সংস্কৃতির উপর তাঁর কাজ বাংলা ভাষাভাষীদের গৌরবকে বৃদ্ধি করে।


ব্যক্তিগত জীবনঃ

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত সৎ ও ধর্মপ্রাণ ছিলেন। ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সামঞ্জস্য রেখে তিনি মুক্তচিন্তা এবং জ্ঞানের প্রসারে অবদান রাখেন। তাঁর জীবনবোধ ও মানবতার প্রতি ভালোবাসা ছাত্রদের মাঝে তাঁকে একটি আদর্শ মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। 


পুরস্কার ও স্বীকৃতিঃ

বাংলা ভাষা এবং সংস্কৃতির ক্ষেত্রে মূল্যবান অবদানের জন্য ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ অনেক পুরস্কার এবং সম্মাননা লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশর ‘একুশে পদক’-এ ভূষিত হন। এছাড়া ১৯৬৬ সালে তিনি পাকিস্তান কর্তৃক ‘তামগা-ই-ইমতিয়াজ’ পদকে ভূষিত হন। 


শেষ কথাঃ

ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ বাংলা ভাষার একজন মহান পথিকৃৎ। তাঁর গবেষণা, শিক্ষা এবং সংস্কৃতি সংরক্ষণে অবদানের জন্য তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে অনন্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্মরণীয় হয়ে রয়েছেন। তিনিই ভাষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন, যা আমাদের ইতিহাসের গৌরবময় অধ্যায়।


ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আমাদের সকলের প্রেরণার উৎস। তাঁর জীবন, দর্শন এবং গবেষণা আমাদের ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা জাগিয়ে তোলে।







Next Post Previous Post